শনিবার, ২৪-আগস্ট ২০১৯, ১১:২৩ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ বাস্তবায়নে গড়িমসি

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ বাস্তবায়নে গড়িমসি

shershanews24.com

প্রকাশ : ৩১ জুলাই, ২০১৯ ০৬:১৬ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: দুর্নীতিবাজ সাবেক ডিজি আবু হেনা মোস্তফা কামালসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরকে (ডিপিই) গত মে মাসে নির্দেশ দেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু নির্দেশ দেয়ার প্রায় দুইমাস অতিক্রান্তের পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোন ব্যবস্থা নিতে পারেনি ডিপিই। এতে ইমেজ সংকটে পড়েছেন ডিপিই’র বর্তমান ডিজি ড. এএফএম মঞ্জুর কাদের। ডিপিইতে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক কানাঘুষা চলছে। অনেকে বলছেন ড. এএফএম মঞ্জুর কাদের নিজে সৎ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু তিনি এখানে দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটটির কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছেন বা তাদের সঙ্গে পেরে উঠছেন না।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত ও শৃঙ্খলা শাখা থেকে গত ৯ মে, ২০১৯ ইং উপ-সচিব মনোয়ারা ইশরাত স্বাক্ষরিত একটি নির্দেশনামা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক মঞ্জুর কাদের বরাবর প্রেরণ করা হয়। পত্রের স্মারক নং-৩৮.০০.০০০০.০০৪.৯৯.০০১.১২-১৬৬। পত্রে বলা হয়, তদন্ত প্রতিবেদনে বর্ণিত অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অবিলম্বে কম গুরুত্বপূর্ণ পদ/শাখা/দায়িত্বে বদলি করতঃ অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করার প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। পত্রে দুর্নীতিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হলেও তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর। এ বিষয়ে ডিপিই ডিজি ড. এএফএম মঞ্জুর কাদেরকে মুঠো ফোনে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্ট কোন উত্তর দিতে পারেন নি। তিনি বলেছেন, দু’এক জনকে বদলি করা হয়েছে। কয়েকজনকে শোকজ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, অধিদফতর চাইলেই সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে না। উপরের পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় থেকে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ বিষয়ে ডিপিই থেকে মন্ত্রণালয়কে কোন চিঠি দেওয়া হয়েছে কি-না জানতে চাইলে, তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। তাই পুরো বিষয়টি নিয়ে এক প্রকার ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে।
শীর্ষকাগজের ১৫তম বর্ষের ৩০তম সংখ্যায় ডিপিই’র সাবেক ডিজি আবু হেনা মোস্তফা কামালসহ ২৫ জন কর্মকর্তাদের নিয়ে ‘প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের সাবেক ডিজিসহ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সম্পর্কে তদন্ত রিপোর্টে যা আছে’ শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এতে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ওইসব কর্মকর্তাদের দুর্নীতির সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়। শীর্ষকাগজের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত ২০১৫ সালের দিকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আসে। অভিযোগ পত্রে ১৩ জন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়। তারা হলেন, পরিচালক সঞ্জয় কুমার চৌধুরী, সহকারী পরিচালক মাহফুজুল ইসলাম, উপপরিচালক শাহনাজ পারভীন, সহকারী পরিচালক ওয়ালিউল ইসলাম, সহকারী পরিচালক এইচ এম কবির হোসেন, সহকারী পরিচালক মির্জা মোঃ আবদুল্লাহ, সহকারী পরিচালক বাদশা মিয়া, শিক্ষা অফিসার রাজা মিয়া, শিক্ষা অফিসার মাহফুজা বেগম, শিক্ষা অফিসার শাসুননাহার, শিক্ষা অফিসার মো: মুজিবুর রহমান, শিক্ষা অফিসার মো: মাহফুজুর রহমান জুয়েল, সহ: শিক্ষা অফিসার নজরুল ইসলাম। শিক্ষা ভ্রমণের নামে বিভিন্ন সময়ে অতিরিক্ত সম্মানী ও টিএ/ডিএ উত্তোলনসহ আরও নানান অভিযোগ আসে তাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তৎকালীন উপপরিচালক হুমায়ুন কবীরের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। কমিটি তদন্ত রিপোর্ট পেশ করলে দেখা যায়, প্রতিবেদনে সেই ১৩ জন ছাড়াও ডিপিও’র তৎকালীন ডিজি আবু হেনা মোস্তফা কামালসহ তার দুর্নীতির সহযোগী আরো ১২ জন কর্মকর্তার নাম ওঠে এসেছে। তারা হলেন, তৎকালীন উপপরিচালক মো: রায়হান, উপপরিচালক ইফতেখার হোসেন ভূঁইয়া, কর্মকর্তা মিজাউল ইসলাম, আতাউর রহমান, সোনিয়া আকবর, সহকারী পরিচালক রাজা মিয়া, শিক্ষা অফিসার মাহফুজা বেগম, শিক্ষা অফিসার শামসুন নাহার, শিক্ষা অফিসার মো: মজিবুর রহমান, শিক্ষা অফিসার মাহফুজুর রহমান জুয়েল, সহ: শিক্ষা অফিসার নজরুল ইসলাম। নতুন করে ওঠে আসা  ১২ জনের নাম ইতিপূর্বে অভিযোগপত্রে ছিল না। আবু হেনার নাম প্রতিবেদনে ওঠে আসায় অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কারণ তিনি ডিপিই’তে স্বঘোষিত উন্ন্য়নের বাতিঘর ছিলেন। নিজের গুণগান ও দেশের প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা ও করণীয় নিয়ে উপদেশমূলক বই লিখেছিলেন। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরেই তার মুখোশ খুলে আসল রূপ বেরিয়ে আসে। তার নেতৃত্বে গঠিত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের রাম-রাজত্ব কায়েম করেছিল। তদন্তে পরিচালক ও উপপরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তাগণই জালিয়াতির মাধ্যমে টিএ/ডিএ উত্তোলনের সাথে সবচেয়ে বেশি জড়িত বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। একই ব্যক্তি একাধিক স্থান থেকে একই সময়ে টিএ/ডিএ উত্তোলন, অতিরিক্ত টিএ/ডিএ উত্তোলন, একই দিনে একই স্থান থেকে একাধিক টিএ/ডিএ ও সম্মানী উত্তোলন, একই সাথে একই পথে ভ্রমণের সময় প্রত্যেক স্থান থেকে টিএ/ডিএ গ্রহণ, ভ্রমণে না গিয়ে টিএ/ডিএ উত্তোলন, আদেশ ছাড়া পরিদর্শন ও ভ্রমণ বিল উত্তোলন, বিমানে ভ্রমণের সময় সকল বিমান বন্দরের জন্য একই টিএ/ডিএ গ্রহণ ইত্যাদি অপকর্ম করেছেন। এই অনিয়মগুলো কেবল অভিযোগপত্রে উল্লেখিত কর্মকর্তারাই করেননি বরং আরো অনেকেই করেছেন। যারা রীতিমত ধরা-ছোঁয়ার বাহিরে। তদন্ত প্রতিবেদনটি ২০১৫ সালে মন্ত্রণালয়ে জমা দিলেও আবু হেনার ক্ষমতার দাপট ও মন্ত্রণালয়ের সাথে সুসম্পর্কের কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় নি। প্রতিবেদনে প্রভাবশালীদের নাম উঠে আসায় বছরের পর বছর প্রতিবেদন ফাইলটি ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল। একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর নতুন মন্ত্রিসভা দায়িত্ব নেয়ার পরপরই দুর্নীতির ফাইলটিকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। বিষয়টি ০১/০৪/২০১৯ইং তারিখে বর্তমান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর গোচরীভূত হলে তিনি সচিব বরাবর একটি অর্ডার লিখেন। অর্ডারটি হলো, ‘অত্র তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত যে সকল কর্মকর্তা ও শিক্ষা অফিসারগণ ডিজি-ডিপিই অফিসে বর্তমানে কর্মরত রয়েছে, তাদেরকে তিন কর্ম দিবসের মধ্যে ঢাকার বাহিরে বদলি করুন এবং অভিযুক্ত সকলের বিরুদ্ধে সরকারি নিয়মবিধি মোতবেক আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে আমাকে লিখিতভাবে অবহিত করুন।’ মন্ত্রীর নির্দেশের প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে এ সংক্রান্ত একটি ফাইল উপস্থাপিত হয়। গত ২৯ এপ্রিল ফাইলটি মন্ত্রীর অনুমোদন প্রাপ্ত হয়। এতে সবাই মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছিল যে, আবু হেনা মোস্তফা কামালসহ তার নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটটি আইনের ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আকরাম-আল-হোসেন বলেছিলেন, ‘প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়েছি। এ ধরনের ঘটনায় যে বা যারাই জড়িত থাকুন না কেন তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ তিনি বলেন, দোষীদের বদলি করে মাঠপর্যায়ে পাঠানো হলে সেখানে তারা আরও সর্বনাশ করবেন। তবে তাদেরকে কম গুরুত্বপূর্ণ পদে পাঠানোসহ নানা ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ আছে। এই বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রতিমন্ত্রীর আদেশে বিষয়টির সুরাহার জন্য গত ০৯/০৫/২০১৯ ইং তারিখে মন্ত্রণালয় থেকে বর্তমান ডিজি ড. মঞ্জুর কাদেরের নিকট একটি পত্র আসে। পত্রে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের কম গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলী করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্র্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু নির্দেশনা আসার প্রায় দুই মাস পরেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তেমন কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অভিযুক্তদের অধিকাংশই পূর্বের পদে বহাল তবিয়তে আছেন অথবা কেউ কেউ বরং পদোন্নতি পেয়ে অন্যত্র আকর্ষণীয় পদে বদলি হয়েছেন বলে জানা যায়।
আবু হেনাসহ অন্যসব দুর্নীতিবাজদের ছাড় দিলে অন্যরাও দুর্নীতিতে উৎসাহিত হবে। তাই অভিযুক্তদের অবিলম্বে শোকজ করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা-কর্মচারীরা । তারা আশংকা করছেন, বর্তমান সিন্ডিকেটটি যদি সমূলে উপড়ে ফেলা না হয় তাহলে দেশের বৃহৎ এই শিক্ষা খাতটি আরও ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে। এতে স্কুলগামী লক্ষ লক্ষ শিশুর সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হবে। সেই সাথে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়বে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৮ জুলাই ২০১৯ প্রকাশিত)